বিশ্বজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: বাংলাদেশে দুই মাসে মৃত ৪৫১ শিশু
মায়ের কোল খালি করে বিশ্বজুড়ে মহামারি আকার ধারণ করছে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ ‘হাম’। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যানুযায়ী, টিকাদানে ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ফলে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম এবং হামের উপসর্গে মোট ৪৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের এবং ৩৭৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৪ ঘণ্টাতেই হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ১২ শিশু। বর্তমানে দেশে ৫৫ হাজার ৬১১ জন শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে, যার মধ্যে ৭ হাজার ৪১৬ জনের দেহে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে ৪০ হাজার ১৭৬ শিশুকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত ৩৬ হাজার ৫৫ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
কেবল বাংলাদেশ নয়, উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রেও হামের বিস্তার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের ১৪ মে পর্যন্ত দেশটিতে ১ হাজার ৮৯৩ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে, যা অন্তত ৪০টি অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন স্বাস্থ্য সংস্থা সিডিসি (CDC) জানিয়েছে, এ বছর এখন পর্যন্ত ২৭টি বড় প্রাদুর্ভাব রেকর্ড করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া এবং জনগণের মধ্যে টিকা গ্রহণে অনীহা এই পরিস্থিতির মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসের তথ্যমতে, হামের প্রাদুর্ভাবে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে ভারত (১৯,৭০৫ জন আক্রান্ত)। তালিকায় এরপরই রয়েছে ইয়েমেন, মেক্সিকো, পাকিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ক্যামেরুন, সুদান, গুয়াতেমালা এবং বাংলাদেশ। এছাড়া এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পৃথিবীর অন্যতম সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে খুব দ্রুত এটি ছড়িয়ে পড়ে। যারা টিকার এক বা উভয় ডোজ নেননি, বিশেষ করে শিশুরা তাদের ক্ষেত্রে এই রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
এই সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, শিশুদের সময়মতো এমএমআর (MMR) টিকা প্রদান নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে আইসোলেশন ও চিকিৎসার আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচিতে শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
