সীমান্ত উত্তেজনা ও নিষেধাজ্ঞার যাতাকলে টেকনাফের হাজারো জেলে
‘এত খারাপ সময় আর আসেনি’
বঙ্গোপসাগরে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ঘোষিত ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। গত ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা চলবে আগামী ১১ জুন পর্যন্ত। তবে টেকনাফের হাজার হাজার জেলের জন্য এই সংকট কেবল দুই মাসের নয়; বরং সীমান্ত উত্তেজনা, জ্বালানি সংকট এবং নিষেধাজ্ঞার ত্রী-মুখী চাপে গত চার মাস ধরে তারা কার্যত কর্মহীন। ফলে অভাব আর ঋণের জালে পিষ্ট হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই জনপদের জেলেরা।
জেলেরা জানিয়েছেন, এবারের পরিস্থিতি অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ। নিষেধাজ্ঞার দেড়-দুই মাস আগে থেকেই জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক নৌকা সাগরে যেতে পারেনি। তার ওপর মিয়ানমার সীমান্তে আরকান আর্মির অস্থিরতা এবং অপহরণ আতঙ্কে নাফ নদী ও সংলগ্ন সাগরে মাছ ধরা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এই পরিস্থিতির রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় সরকারি নিষেধাজ্ঞা।
শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম পাড়ার জেলে রহিম উল্লাহ দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরছেন। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় এমন খারাপ সময় আর দেখেননি বলে জানান। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "আরাকান আর্মির কারণে ঠিকমতো সাগরে যেতে পারিনি, এরপর শুরু হলো তেলের অভাব। এখন চলছে নিষেধাজ্ঞা। চার মাস ধরে আয়-রোজগার নেই। ৮ জনের পরিবার নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে। এত খারাপ সময় আমাদের জীবনে আর আসেনি, সংসার আর চলছে না।"
একই আক্ষেপ শোনা গেল মো. সুলায়মান ও বেলাল উদ্দিনসহ অসংখ্য জেলের কণ্ঠে। আয়ের বিকল্প পথ না থাকায় অধিকাংশ জেলেই এখন মহাজনী দাদন ও ঋণের জালে আটকা পড়েছেন।
উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফে নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ১০ হাজার ৬৮৩ জন। তবে এর বাইরেও আরও কয়েক হাজার অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন যারা সরকারি কোনো সহায়তাই পান না। নিবন্ধিত জেলেরা সরকারি চাল সহায়তা পেলেও তাদের অভিযোগ, কেবল চাল দিয়ে একটি বড় পরিবারের সম্পূর্ণ খরচ চালানো অসম্ভব।
শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিম ঘাটের প্রধান আব্দুর গফুর বলেন, "নিবন্ধিত অনেক জেলেও সময়মতো সহায়তা পান না। আর যে চাল দেওয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। জেলেরা জীবিকার অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার অভাবে ভুগছেন, কিন্তু তাদের এই কষ্ট নিয়ে ভাবার কেউ নেই।"
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের খাদ্য সহায়তার জন্য টেকনাফে ৮২৬ মেট্রিক টনের বেশি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং তা দ্রুত বিতরণের কাজ শুরু হবে। জ্বালানি সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে মাঠ পর্যায়ের জেলেরা বলছেন, শুধু চাল সহায়তা দিয়ে তাদের এই দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তারা এই সংকটকালীন সময়ে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা এবং সীমান্তে জেলেদের নিরাপত্তার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
