ঢাকা রবিবার, ২৪শে মে ২০২৬, ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


রংপুরের পশুর হাটে ধীরগতি: তিন সংকটে অস্বস্তিতে ক্রেতা-বিক্রেতা


প্রকাশিত:
২৪ মে ২০২৬ ১২:৪৬

আসন্ন ঈদুল আজহাকে ঘিরে রংপুর বিভাগের পশুর হাটগুলোতে গরু-ছাগলের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও বেচাকেনায় দেখা দিয়েছে ধীরগতি। একদিকে হাটে পর্যাপ্ত পশুর উপস্থিতি, অন্যদিকে ক্রেতা-বিক্রেতার অনাগ্রহ—সব মিলিয়ে কোরবানির বাজার এখন অনেকটাই থমথমে। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যমতে, এ বছর বিভাগে চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫ লাখ ৫৬ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকলেও মাঠপর্যায়ে কেনাবেচার চিত্র বেশ হতাশাজনক।

তিন সংকটে থমকে বাজার
রংপুরের বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত তিনটি কারণে এবারের কোরবানির বাজার জমে উঠছে না।

প্রথমত, বৈরী আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টির কারণে হাটগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা ও কর্দমাক্ত পরিবেশ, যা ক্রেতাদের হাটে আসার আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, দালাল ও ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য। হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতারা অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত হাসিলের বাইরেও দালাল ও ইজারাদারদের লোকজন নানাভাবে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের চেষ্টা করছেন।

তৃতীয়ত, পরিবহণ খরচের ঊর্ধ্বগতি। আগের বছরগুলোতে ঢাকা বা চট্টগ্রামের পাইকাররা রংপুরের হাটগুলো থেকে যে হারে পশু কিনতেন, এবার সেই সংখ্যা অনেক কম। অতিরিক্ত পরিবহণ খরচ ও পথে পথে ঝক্কি-ঝামেলার ভয়ে পাইকাররা এবার অনেকটা দূরেই থাকছেন।

খামারে ঝুঁকছেন ক্রেতা
হাটের হয়রানি এড়াতে এবার অনেক ক্রেতা সরাসরি খামারমুখী হয়েছেন। রংপুর নগরীর বিভিন্ন ক্যাটল ফার্মে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। ওজন মেপে স্বচ্ছ দামে পশু কেনার সুযোগ থাকায় সাধারণ ক্রেতাদের কাছে খামারগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে এতে সরকারি রাজস্ব আদায়ের হার কমার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কী বলছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ?
বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে কোরবানির চাহিদা ১৪ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭টির বিপরীতে এ বছর ২০ লাখ ২৩ হাজার ৬৭টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হাই সরকার বলেন, “রংপুর অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পশু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। আমরা অসুস্থ পশু শনাক্তকরণ, জাল টাকা রোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি।”

পশু খাদ্য ও বাজারের প্রভাব
খামারিদের দাবি, পশুখাদ্য ও ওষুধের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। রংপুর ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লতিফুর রহমান মিলন জানান, মাংসের উৎপাদন খরচ অনুযায়ী দাম না পেলে খামারিদের লোকসান গুনতে হবে। বর্তমানে হাটে ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকলেও বড় গরুর ক্রেতা তুলনামূলক কম।

অর্থনীতিতে ১২ হাজার কোটি টাকার হাতছানি
প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এবার রংপুর অঞ্চলের কোরবানির পশুর বাজার থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

এখন দেখার বিষয়, ঈদের শেষ সময়ে বাজার ঘুরে দাঁড়ায় কি না, নাকি খামারকেন্দ্রিক কেনাবেচাই এবার কোরবানির বাজারের মূল নিয়ামক হয়ে থাকে।