পুলিশের চাকরির আড়ালে ‘আদম ব্যবসা সিন্ডিকেট’! কনস্টেবল মোরশেদ আনোয়ারের বিরুদ্ধে ভয়ংকর প্রতারণার অভিযোগ
পুলিশের চাকরির আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে লোক পাঠানোর নামে গড়ে উঠেছিল একটি সংঘবদ্ধ আদম ব্যবসার সিন্ডিকেট—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে কনস্টেবল মোরশেদ আনোয়ারের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রতন মুন্সি ও জনৈক বিল্লালকে সঙ্গে নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিদেশগামীদের টার্গেট করে কোটি টাকার প্রতারণা চালিয়ে আসছিল এই চক্র।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের মূল হোতা মোরশেদ আনোয়ার ঢাকায় বসে পুলিশের পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখাতেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে পারিবারিক সম্পৃক্ততার কারণে তিনি নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং সেই ক্ষমতার দাপটেই দীর্ঘদিন নিরাপদে আদম ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
টুরিস্ট ভিসার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাগুরা সদর থানার নোয়াপাড়া গ্রামের বাবু শেখ (পিতা-মৃত ছেকেন শেখ) এবং দ্বাড়িয়াপুর গ্রামের ছত্তার মিয়া (পিতা-মৃত আব্দুল কাদির মিয়া)-কে টুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে মোট ৮ লাখ টাকায় চুক্তি করেন মোরশেদ আনোয়ার। চুক্তি অনুযায়ী, প্রথমে দুইজন মিলে ১ লাখ টাকা মোরশেদ আনোয়ারের বাড়িতে তার বাবা-মায়ের সামনেই বুঝিয়ে দেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, পরবর্তীতে ভিসা হওয়ার আশ্বাস দিয়ে বাকি ৭ লাখ টাকা ঢাকায় নিয়ে নেওয়া হয়। বাবু শেখ, ছত্তার মিয়া এবং স্থানীয় মিন্টু শেখ (পিতা-হোসেন শেখ, সাং-রামচন্দ্রপুর) ও জামাল (পিতা-কালাম শেখ) একত্রে একটি শপিং ব্যাগে করে নগদ টাকা ঢাকায় নিয়ে যান। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশে যেখানে মোরশেদ আনোয়ার অবস্থান করতেন, সেখানে তার হাতেই পুরো টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
গ্রামের পর গ্রাম থেকে সংগ্রহ করা হতো বিদেশগামী
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দ্বারিয়াপুর গ্রামকে কেন্দ্র করে বিদেশে লোক পাঠানোর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন মোরশেদ আনোয়ার। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দ্বারিয়াপুর এলাকার জামিরুল, সোহেল রানা, সোহেল মিয়া, আবু সালেহ, নাইমুল, দাউদ, আরমান মোল্যা ও রাকিব মোল্যাসহ একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করা হয়। এসব অর্থ ও কাগজপত্র সংগ্রহে সরাসরি অংশ নেন মোরশেদ আনোয়ার ও তার সহযোগী রতন মুন্সি।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোরশেদ আনোয়ার নিজেই তাদের ঢাকায় নিয়ে যেতেন। সেখানে পূর্ব থেকে ভাড়া করা একটি ফ্ল্যাটে কয়েকদিন রাখার পর মেডিকেল করানো হতো। কারও কারও ক্ষেত্রে দুইবার পর্যন্ত মেডিকেল করানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। এরপর বিদেশ পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘদিন ঘুরানো হলেও শেষ পর্যন্ত অনেকেই প্রতারণার শিকার হন।
মালয়েশিয়ার নামে ভারতে পাঠানোর অভিযোগ
অন্য আরেকটি অনুসন্ধানে ভয়াবহ প্রতারণার নতুন তথ্য উঠে এসেছে। বিদেশ থেকে ভিডিও সাক্ষাৎকারে মাগুরা সদর থানার পার্শ্ববর্তী মির্জাপুর গ্রামের সবুজ হোসেন অভিযোগ করেন, তাকে মালয়েশিয়ায় নেওয়ার কথা বলে প্রায় ৫ লাখ টাকা নেয় মোরশেদ আনোয়ার, বিল্লাল ও রতন মুন্সি। কিন্তু মালয়েশিয়ায় না পাঠিয়ে প্রথমে ঢাকায় তাদের ভাড়াকৃত বাসায় চার দিন রাখা হয়। পরে তাকে ভারতে পাঠানো হয়। সেখানে ১৮ দিন অবস্থানের পর আবার দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
সবুজ হোসেনের দুলাভাই মারুফ হোসেন জানান, তার মাধ্যমেই মোরশেদ আনোয়ারের হাতে পাসপোর্ট ও টাকা তুলে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় মোরশেদ আনোয়ার নিজেই আশ্বাস দিয়ে বলেন, “টাকা নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না।”
সবুজের বন্ধু সোহেল রানা বলেন, বিদেশ যাত্রার প্রক্রিয়া এগিয়ে দিতে তিনি নিজেও সবুজের সঙ্গে ঢাকায় যান। সেখানে মোরশেদ, বিল্লাল ও রতনের ভাড়া করা বাসায় কয়েকদিন থাকার পর সবুজকে মালয়েশিয়ার কথা বলে ভারতে পাঠানো হয়। পরে দীর্ঘদিন ভোগান্তির পর সে দেশে ফিরে আসে।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন প্রতিবেশী আজিজুর রহমান, সবুজের বাবা-মা ও স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি। তাদের দাবি, পুরো ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং পরবর্তীতে টাকার বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর থানায় একাধিক সালিশ বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ওই সালিশের পরিপ্রেক্ষিতে মোরশেদ আনোয়ার নিজেই টাকার দায় স্বীকার করেন এবং টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু পরে টাকা পরিশোধ না করে উল্টো পুলিশি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেন।
অডিও রেকর্ডে উঠে এসেছে টাকার চাপ ও প্রতারণার চিত্র
অনুসন্ধানে পাওয়া একাধিক অডিও কল রেকর্ডে মোরশেদ আনোয়ার, রতন মুন্সি ও বিল্লালের কথোপকথনে বিদেশে লোক পাঠানো, টাকা আদায় এবং ব্যর্থতার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নানা বিষয় উঠে এসেছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
একটি অডিওতে মোরশেদ আনোয়ারকে বলতে শোনা যায়— “আমি কিছু টাকা তো ফেরত দিয়েছি। আমাকে জেলে দিলে তো আর টাকা দিতে পারব না। ভাই, একটু সময় দেন। পেনশন বিক্রি করে হলেও আপনাদের টাকা দিয়ে দেব।”
আরেকটি রেকর্ডে তাকে বিদেশগামীদের মেডিকেলের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে পাঠাতে এবং ভিসার সম্ভাব্য তারিখ জানিয়ে দ্রুত টাকা দিতে চাপ প্রয়োগ করতে শোনা গেছে।
সবচেয়ে আলোচিত একটি কল রেকর্ডে মোরশেদ আনোয়ারকে বলতে শোনা যায়— “২৫/৩০ লাখ টাকা কিছুই না। এই টাকা নিয়ে কেউ কোথাও যেতে পারবে না। যাদের টাকা দিচ্ছি, তাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি।”
সেখানে তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে “ফাইলে ফেলে” কীভাবে টাকা আদায় করতে হয়, তা তার জানা আছে।
সহযোগীকে বিদেশে পাঠিয়ে ‘আড়াল’ নেওয়ার অভিযোগ
বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পর মোরশেদ আনোয়ার অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে তার সহযোগী রতন মুন্সিকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এরপর এলাকায় প্রচার করা হয় যে রতন মুন্সির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে স্থানীয়দের দাবি, রতন মুন্সি বিদেশে চলে গেলেও তার সব ঝামেলা ও দেনদরবার মোরশেদ আনোয়ার নিজেই নিয়ন্ত্রণ ও সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ঘোরানোর পর একসময় শুধু পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হলেও অধিকাংশ ভুক্তভোগী তাদের টাকা আর ফেরত পাননি। এতে অনেকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
তদন্তের দাবি
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা মানবপাচার, প্রতারণা ও অবৈধ আদম ব্যবসার অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, পুলিশের পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হয়েছে। পুরো সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় এনে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরতেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত মোরশেদ আনোয়ার, রতন মুন্সি ও বিল্লালের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
