ঐতিহাসিক জয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সূচনা করে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হেভিওয়েট নেতা শুভেন্দু অধিকারী। আজ শনিবার কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর উপস্থিতিতে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলো হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি। শুভেন্দু অধিকারীর এই শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ১৯৬৭ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছিলেন। প্রায় ৫৯ বছর পর শুভেন্দুও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটালেন ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের দুর্গ ভবানীপুরে পরাজিত করার মাধ্যমে।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি তাঁর মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ সদস্যও শপথ নিয়েছেন। নতুন এই সরকারের প্রথম মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা দিলীপ ঘোষ। এরপর পর্যায়ক্রমে শপথ গ্রহণ করেন অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু। এই মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন বিজেপিশাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। গত সোমবারের নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে, ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে বিজেপি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। শুভেন্দু অধিকারী খোদ বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে ভবানীপুর আসনে ১৫,৫০৫ ভোটে পরাজিত করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে নতুন পরিচিতি লাভ করেছেন, যিনি পর পর দুটি নির্বাচনে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করার অনন্য রেকর্ড গড়লেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুভেন্দু অধিকারীর এই উত্থানের সাথে বাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের জীবনের অদ্ভুত মিল রয়েছে। অজয় মুখোপাধ্যায় যেমন কংগ্রেস ত্যাগের আগে সেচমন্ত্রী ছিলেন এবং মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনকে হারিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি শুভেন্দুও তৃণমূল ত্যাগের আগে সেচ দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসলেন। শুভেন্দু অধিকারী তাঁর নতুন দায়িত্ব নিয়ে অঙ্গীকার করেছেন যে, তাঁর সরকার ‘আমি নয়, আমরা’—এই আদর্শে পরিচালিত হবে। রাজ্যে দীর্ঘদিনের ভয়ের পরিবেশ কাটিয়ে একটি সুস্থ ও নিরাপদ ‘ভরসার পরিবেশ’ গড়ে তোলা এবং কম কথায় বেশি কাজ করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এই সরকার একক শক্তিতে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধার মুখে পড়বে না বলে মনে করা হচ্ছে।
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল ছাত্র রাজনীতি এবং কংগ্রেসের হাত ধরে। পরবর্তীতে তাঁর বাবা শিশির অধিকারীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে সারা রাজ্যে মেহনতি মানুষের নেতা হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। একসময় তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে বিবেচিত শুভেন্দু ২০২০ সালে নেতৃত্বের সাথে মতবিরোধের জেরে বিজেপিতে যোগ দেন। এরপর থেকেই তিনি মমতাবিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। মেদিনীপুরের কাঁথি শহরের এক রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা এই অবিবাহিত নেতা এখন পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার হাতে নিলেন। উন্নয়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের এই সন্ধিক্ষণে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্ব পশ্চিমবঙ্গকে কোন অভিমুখে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
