ঢাকা রবিবার, ২৪শে মে ২০২৬, ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


সংসদ ভবন থেকে উধাও ১৩৪৩ কপার বার: নথিপত্রে কারসাজি, দায় এড়ানোর চেষ্টায় প্রকৌশলীরা


প্রকাশিত:
২৪ মে ২০২৬ ১২:৫৮

দেশের সর্বোচ্চ সুরক্ষিত স্থাপনা জাতীয় সংসদ ভবনের স্টোররুম থেকে উধাও হয়ে গেছে ১ হাজার ৩৪৩টি মূল্যবান কপার বার। সরকারি হিসাবে যার বাজারমূল্য প্রায় ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় খোদ সংসদ ভবনের কর্মকর্তাদের মধ্যে দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তদন্ত কমিটি এই অনিয়মের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দায়ী করলেও, রহস্যজনক কারণে প্রকৃত সত্য এখনো ধামাচাপা পড়ে আছে।

উধাও হওয়ার নেপথ্যে অসংলগ্ন নথি
সংসদ ভবনের নবম তলায় সাব-স্টেশন উন্নয়ন প্রকল্পের (আমব্রেলা প্রজেক্ট) কাজ পায় ‘এডেক্স করপোরেশন লিমিটেড’। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী, কাজ শেষে অবশিষ্ট সরঞ্জাম স্টোরে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, একই কাজের জন্য দুইবার সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে, যার একটির সঙ্গে অন্যটির মিল নেই। প্রথম রিপোর্টে স্বাক্ষর বা তারিখের বালাই নেই, আবার দ্বিতীয়টিতে পরিমাণ ও মূল্যে ব্যাপক অসামঞ্জস্য রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম ঢাকতে নথিতে একের পর এক জালিয়াতি করা হয়েছে।

দায়ের বৃত্তে প্রকৌশলীরা
এই ঘটনায় সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিপুল পরিমাণ ধাতব সরঞ্জাম উধাও হওয়ার দায় নিতে নারাজ কোনো কর্মকর্তাই। বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ পুরো দায় চাপিয়েছেন বদলি হওয়া উপসহকারী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিনের ওপর। অথচ হেলাল উদ্দিনের দাবি, তিনি মাত্র পাঁচ মাস দায়িত্বে ছিলেন এবং তাকে স্টোরের কোনো সরঞ্জাম বা প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা কখনোই বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, দীর্ঘ তিন বছর ধরে দায়িত্বে থাকা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ সব কাজের মূল তদারককারী হলেও বিষয়টি নিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

ঠিকাদারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও কমিশন বাণিজ্য
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সূত্রে জানা যায়, কাজের বিল নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে এডেক্স করপোরেশনের দ্বন্দ্ব ছিল। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী ঠিকাদারের কাছে মোটা অঙ্কের কমিশন দাবি করেছিলেন, যা না দেওয়ায় ঠিকাদারের ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিল আটকে দেওয়া হয়। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সিইও নুরুন নবী সুজন জানিয়েছেন, তারা কাজের পুরো টাকা না পেয়ে আইনি পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কপার বার চুরির বিষয়ে তিনি সরাসরি কিছু না জানলেও, পুরো প্রক্রিয়াটিতে যে দুর্নীতির ছায়া স্পষ্ট, তা সংশ্লিষ্টদের কথাবার্তায় ফুটে উঠেছে।

নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন
সংসদ ভবনের মতো কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো থাকা এবং বিপুল পরিমাণ ভারী কপার বার কীভাবে বাইরে চলে গেল—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী নেতারা। তাদের মতে, এটি নিছক চুরি নয়, বরং একটি বড় মাপের দুর্নীতির ফসল। কোনো ধরনের সার্ভে রিপোর্ট ছাড়াই এবং সিসিটিভির নজরদারি এড়িয়ে এত মালপত্র সরানো অসম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ও বর্তমান অবস্থা
গত ২৫ মার্চ গঠিত চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি কপার বার উধাও হওয়ার ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের দায়ী করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালিকুজ্জামান চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এদিকে, দায়িত্বরত কর্মকর্তারা নিজেদের বাঁচাতে পুরোনো কিছু কপার বার ব্যবহার করে জালিয়াতি ঢাকার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কারা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত এবং কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ গলে যাওয়ার পেছনে আসল মাস্টারমাইন্ড কে? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তই পারে এই দুর্নীতির মূল রহস্য উন্মোচন করতে।