ঢাকা রবিবার, ৩১শে মে ২০২৬, ১৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


সুন্দরবন বাঁচাতে ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞা: উপকূলে ৫০ হাজার বনজীবী পরিবারের দুশ্চিন্তা


প্রকাশিত:
৩১ মে ২০২৬ ১৩:৪৯

প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা ও মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামীকাল ১ জুন থেকে সুন্দরবনে শুরু হচ্ছে তিন মাসের বার্ষিক নিষেধাজ্ঞা। এই সময় বন থেকে মাছ-কাঁকড়া আহরণ, পর্যটক প্রবেশসহ সব ধরনের মানবিক চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে বন রক্ষার এই উদ্যোগ উপকূলীয় হাজারো জেলে পরিবারের জন্য নিয়ে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। পর্যাপ্ত বিকল্প কর্মসংস্থান ও সরকারি সহায়তার অভাবে আগামী ৯০ দিন অর্ধাহারে-অনাহারে কাটানোর শঙ্কায় দিন গুনছেন সুন্দরবননির্ভর প্রায় ৫০ হাজার বনজীবী।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছরের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সব নদী ও খালে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাস মাছের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় মাছ ও বন্য প্রাণীর বংশবিস্তারের স্বার্থেই এই কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় বনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগেই গহীন সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে ফিরতে শুরু করেছেন জেলে, বাওয়ালি ও ট্রলারচালকরা। কিন্তু ঈদের আমেজ কাটতে না কাটতেই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কালো ছায়া নেমে এসেছে তাদের চোখেমুখে।

মুন্সীগঞ্জ গ্রামের বনজীবী ইসমাইল হোসেন জানান, সুন্দরবনের সম্পদ আহরণই তাদের একমাত্র জীবিকা। তিন মাস পাস বন্ধ থাকায় সংসার কীভাবে চলবে, তা নিয়ে তিনি দিশেহারা। মীরগাঙ গ্রামের মৎস্যজীবী আবিয়ার গাজী অভিযোগ করেন, সাগরে মাছ ধরা জেলেদের বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হলেও সুন্দরবনের জেলেদের জন্য সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা খুবই সীমিত। এই দুঃসময়ে সরকারি সহায়তা না পেলে পরিবার নিয়ে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়বে।

শুধু বনজীবীরাই নন, আর্থিক সংকটের আশঙ্কায় আছেন ট্রলার মালিক ও মাঝিরাও। নীলডুমুর পর্যটকবাহী ট্রলারের মাঝি রিপন গাজী বলেন, ‘তিন মাস ট্রলার অচল পড়ে থাকবে। অথচ এই সময়ে ট্রলার রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবারের খরচ মেটানো আমাদের জন্য অসম্ভব।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাধারণ জেলেরা আইন মেনে বন থেকে দূরে থাকলেও নিষিদ্ধ সময়ে কিছু প্রভাবশালী মাছ ব্যবসায়ী ও অসাধু চক্র সুযোগ বুঝে বনে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করে। এতে যেমন বনের ক্ষতি হয়, তেমনি প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হন।

এ বিষয়ে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌহিদ হাসান বলেন, ‘সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলেদেরও সরকারি সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাদের কষ্টের কথা বিবেচনায় নিয়ে আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।’

বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘বনকে সুস্থ ও সুন্দরবনকে প্রাণচঞ্চল রাখতে এই নিষেধাজ্ঞা অপরিহার্য। তবে নিষিদ্ধ সময়ে বিষ প্রয়োগসহ যেকোনো ধরনের অসাধু কর্মকাণ্ড বন্ধে বন বিভাগ এবার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে।’

উপকূলের সাধারণ মানুষের দাবি, প্রতি বছর সুন্দরবন বন্ধের এই সময়টিতে যেন অসহায় বনজীবী পরিবারগুলোর জন্য ভিজিএফ বা বিশেষ খাদ্য সহায়তার বরাদ্দ দেওয়া হয়, যাতে তারা অভাবের তাড়নায় অসাধু পথে পা না বাড়ায়।