ঢাকা রবিবার, ১৭ই মে ২০২৬, ৩রা জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


ক্ষমতায় এসেই কড়া মেজাজে শুভেন্দু

প্রথম সপ্তাহেই বুলডোজার নীতি, ধর্মীয় কড়াকড়ি ও রাজনৈতিক সহিংসতায় উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ


প্রকাশিত:
১৬ মে ২০২৬ ১৮:০৭

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম সরকার গঠনের পর দায়িত্ব নিয়েই একের পর এক কঠোর ও বিতর্কিত পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারের প্রথম সপ্তাহ পার হতে না হতেই প্রশাসনিক রদবদল, সীমান্তনীতি, 'বুলডোজার' অভিযান এবং ধর্মীয় আচারে কড়াকড়ির মতো সিদ্ধান্তগুলো রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও রাজনৈতিক উত্তাপের জন্ম দিয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এসব পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।

নির্বাচন মিটতে না মিটতেই রাজ্যজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের দাবি, সরকার গঠনের প্রথম সাত দিনেই পরিকল্পিতভাবে তৃণমূল কর্মীদের ওপর হামলা ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর চালানো হয়েছে, যার ফলে বহু কর্মী প্রাণভয়ে ঘরছাড়া। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে এবং কর্মীদের সুরক্ষার দাবিতে গত ১২ মে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি, সহিংসতা কবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শনের জন্য তিনি একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটিও গঠন করেছেন।

নবান্নে দায়িত্ব নিয়েই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কড়া হাতে প্রশাসন সাজাতে শুরু করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি কলকাতার সাবেক পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলসহ তিন জ্যেষ্ঠ আইপিএস কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার কথা ঘোষণা করেন। আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা ভুলভাবে সামলানোর অভিযোগে এই ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বিরোধীরা এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দেখছেন। সিপিআই-এম রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে প্রশ্ন তুলেছেন, আরজি কর মামলায় সিবিআই আসলে কী করেছে? বড় কোনও ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন করতে ব্যর্থ হলেও সিবিআই কর্মকর্তাদের উল্টো পুরস্কৃত করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

গত ১২ মে কলকাতার তিলজলার একটি চামড়া কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই শ্রমিকের মৃত্যু ও পাঁচজন আহত হন। এই মর্মান্তিক ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে কারখানা ভবনটিকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সরকারের এই একতরফা পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করেছেন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, মালিকদের কাগজপত্র দেখানোর ন্যূনতম সময় না দিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সুশাসনের উদাহরণ হতে পারে না। বাম নেতা মোহাম্মদ সেলিমও প্রশ্ন তুলেছেন, "বুলডোজার দিয়ে ভবন তো ভাঙা হলো, কিন্তু যে দরিদ্র শ্রমিকরা মারা গেলেন বা কাজ হারালেন, তাদের ক্ষতিপূরণের কী হবে?"

গত ১৩ মে রাজ্য সরকারের জারি করা একটি কঠোর বিজ্ঞপ্তি নিয়েও বিতর্ক দানা বেঁধেছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, জনসমক্ষে পশু কোরবানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া রাস্তা আটকে কোনও নিয়মিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করা যাবে না এবং মন্দির-মসজিদসহ রাজ্যের সব উপাসনালয়ে লাউডস্পিকারের শব্দ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিরোধীদের মতে, এই নির্দেশিকা বহু মানুষের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ।

শুভেন্দু সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি করেছে। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে (এসআইআর) যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তারা আর রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। বিরোধীদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বহু মানুষকে মৌলিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয় থেকে বঞ্চিত করতেই এই ছক কষা হয়েছে। এর পাশাপাশি, রেশন কার্ড স্ক্রিনিংয়ের নামে ‘অ-ভারতীয়’ খোঁজার অজুহাতে সাধারণ মানুষকে অযথা হেনস্তা করা হচ্ছে বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের প্রথম সপ্তাহেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেওয়া এই একের পর এক আগ্রাসী সিদ্ধান্ত বুঝিয়ে দিচ্ছে, আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আরও সংঘাতময় হতে চলেছে।