ঢাকা মঙ্গলবার, ১৯শে মে ২০২৬, ৬ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


'প্রতিদিনের আলো' নামের ভুয়া পোর্টালের ফাঁদ, লিংক মুছে ফেলার শর্তে বিএমইটি পরিচালকের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি


প্রকাশিত:
১৯ মে ২০২৬ ১৭:১৮

সাংবাদিকতার আড়ালে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর এক চাঁদাবাজ চক্র। ভুয়া ও নিবন্ধনহীন অনলাইন পোর্টাল খুলে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করাই এদের মূল পেশা। এবার এই চক্রের নিশানায় পরিণত হয়েছেন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাসুদ রানা।

'প্রতিদিনের আলো' (pratidineralo.com) নামের একটি ভুয়া অনলাইন পোর্টালের সম্পাদক পরিচয়দানকারী এস.এ. শাওন নামের এক ব্যক্তি মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে এই কর্মকর্তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন।

যেভাবে পাতা হয় চাঁদাবাজির ফাঁদ ও ব্ল্যাকমেইল: অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি 'প্রতিদিনের আলো' নামের ওই নামসর্বস্ব পোর্টালে বিএমইটি পরিচালক মাসুদ রানাকে নিয়ে একটি ভিত্তিহীন ও মানহানিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনে কোনো ধরনের তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই দাবি করা হয় যে, দুর্নীতি করে তিনি মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে ভিলা গড়েছেন।

মূলত এই বানোয়াট সংবাদটি প্রকাশ করাই ছিল চাঁদাবাজির প্রথম ধাপ। সংবাদটি পাবলিশ করার পরই ওই ভুয়া পোর্টালের সম্পাদক পরিচয়দানকারী এস.এ. শাওন +880 1404-650411 নম্বর থেকে সংবাদের লিংকটি পরিচালক মাসুদ রানার কাছে পাঠান। এরপর সরাসরি ফোন করে তিনি ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।

এ সময় ওই চাঁদাবাজ চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে হুমকি দেন যে, চাহিদামতো ১০ লাখ টাকা দেওয়া হলে ওয়েবসাইট থেকে সংবাদের লিংকটি ডিলিট (মুছে ফেলা) করে দেওয়া হবে। আর যদি টাকা না দেওয়া হয়, তবে এই বানোয়াট সংবাদটিই ফেসবুকে টাকা দিয়ে 'বুস্ট' করে সর্বত্র ভাইরাল করে দেওয়া হবে, যাতে ওই কর্মকর্তার চরম সম্মানহানি হয়।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো ভুয়া ঠিকানার গোমর: চাঁদাবাজির এই ভয়ংকর হুমকির পর পোর্টালটির সত্যতা যাচাইয়ে নামে আমাদের অনুসন্ধানী দল। পোর্টালটির ওয়েবসাইটে দেওয়া ঠিকানায় (বাড়ি-১০/কে, ৬ষ্ঠ তলা, নয়াপল্টন হাউজিং, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০) সরাসরি খোঁজ নেওয়া হয়।

সেখানে গিয়ে চরম চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। আমাদের প্রতিনিধি সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান, ওই ঠিকানায় 'প্রতিদিনের আলো' নামের কোনো পত্রিকা বা অনলাইনের কোনো কার্যালয় নেই। এটি সম্পূর্ণ একটি ভুয়া বা অস্তিত্বহীন ঠিকানা। স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন যে, এই নামে কোনো অফিস কখনোই সেখানে ছিল না।

ওয়েবসাইটের তথ্যের সাথে চাঁদাবাজির হুবহু মিল: পোর্টালটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, লিংক পাঠিয়ে চাঁদা দাবির জন্য যে নম্বরটি (+880 1404-650411) ব্যবহার করা হয়েছে, ওয়েবসাইটের যোগাযোগ নম্বরেও ঠিক একই মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। সেখানে সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে 'এস.এ. শাওন (এল.এল.বি)' এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে 'রাবিব চৌধুরী'র নাম উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া যোগাযোগের জন্য একটি সাধারণ জিমেইল অ্যাকাউন্ট ([email protected]) ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণত এ ধরনের প্রতারক চক্রগুলো করে থাকে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কাম্য: হলুদ সাংবাদিকতার নামে অস্তিত্বহীন অফিস থেকে ভুয়া সংবাদ প্রচার, লিংক পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইল এবং ফেসবুকে ভাইরাল করার হুমকি দিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির এই ঘটনা সাইবার নিরাপত্তা আইনে সুস্পষ্ট ও জামিন অযোগ্য অপরাধ।

ইতোমধ্যেই এই ভুয়া সম্পাদক এস.এ. শাওন ও তার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উক্ত মোবাইল নম্বরটির (০১৪০৪-৬৫৪১১) কললিস্ট এবং ওয়েবসাইটের ডোমেইন রেজিস্ট্রেশনের তথ্য ধরে তদন্ত করলেই এই চাঁদাবাজ চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।