ঢাকা রবিবার, ১৭ই মে ২০২৬, ৩রা জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


৮৯ শতাংশ নারীই শিকার

ডিপফেক, ব্ল্যাকমেইল ও ট্রলিংয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠছে সাইবার জগৎ


প্রকাশিত:
১৬ মে ২০২৬ ২০:০৮

রাত তখন প্রায় আড়াইটা। সামাজিক একটি ইস্যু নিয়ে ফেসবুকে নিজের মতামত পোস্ট করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার কমেন্ট বক্স ভরে যায় যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, অশ্রাব্য ভাষা আর ধর্ষণের হুমকিতে। এরপর পুরোনো ছবি সংগ্রহ করে বিকৃতভাবে সম্পাদনা করে কয়েকটি অচেনা অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টই বন্ধ করে দেন ওই শিক্ষার্থী।

শুধু ওই শিক্ষার্থীই নন; প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের অনলাইন উপস্থিতি যেমন বেড়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা, সাইবার হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, ডিপফেক এবং সমন্বিত অনলাইন আক্রমণের ঘটনা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএর ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী ব্যবহারকারী তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির শিকার নারীদের মধ্যে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ এবং অপমানের ভয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভুক্তভোগী এসব ঘটনা কোথাও প্রকাশ করেন না।

বাংলাদেশ পুলিশের ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ (পিসিএসডব্লিউ) ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধসংক্রান্ত সহায়তা চেয়ে যোগাযোগ করেছেন ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী। এর মধ্যে ৪১ শতাংশ ডক্সিংয়ের (গোপন তথ্য ফাঁস) শিকার হয়েছেন। এছাড়া ১৮ শতাংশের ফেসবুক হ্যাক, ১৭ শতাংশ ব্ল্যাকমেইল, ৯ শতাংশ ভুয়া পরিচয় এবং ৮ শতাংশ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ইউনিটটিতে ৪৩ হাজারের বেশি অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরানোর ১৩ হাজার ২৩টি অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই করেছেন নারীরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন সহিংসতা এখন আর শুধু ‘খারাপ মন্তব্য’ বা ‘ট্রলিং’-এ সীমাবদ্ধ নেই। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিপফেক ও সমন্বিত ডিজিটাল হামলার রূপ নিয়েছে। গাজীপুরের এক নারী কনটেন্ট নির্মাতা জানান, লাইভ সেশনে নিয়মিত যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যের পাশাপাশি তাকে ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

‘পারসেপশন অব ডিপফেকস অ্যামং বাংলাদেশি উইমেন’ শীর্ষক ২০২৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ডিপফেক প্রযুক্তি নারীদের মধ্যে নতুন ধরনের আতঙ্ক তৈরি করছে। ইউএন উইমেনের ২০২৫-২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তি নারী সাংবাদিক ও জনসম্মুখে থাকা নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতাকে আরও ‘সংঘবদ্ধ ও বিপজ্জনক’ করে তুলছে। ডিজিটাল সহিংসতা এখন ‘স্ক্রিন থেকে বাস্তব জীবনে’ ছড়িয়ে পড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, “নারীরা যখন অনলাইনে দৃশ্যমান হন বা মতামত দেন, তখন তারা প্রায়ই সমন্বিত ডিজিটাল হামলার শিকার হন। এটি মূলত ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের একটি রূপ, যা নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাসের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।”

দীর্ঘদিন অনলাইন হামলার মুখে থাকলে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও আত্মবিশ্বাস হারানোর মতো সমস্যা তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. শাহানা পারভীন। অন্যদিকে, নারী অধিকারকর্মী নাজমা বেগম বলেন, “আমাদের সমাজে এখনও নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ছবি ফাঁস হলে অপরাধীর বদলে অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।”

দেশে অনলাইন হয়রানি মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো কঠোর আইনি কাঠামো রয়েছে। ডিজিটাল অপরাধের বিচারের জন্য রয়েছে সাইবার ট্রাইব্যুনাল।

তবে আইনি কাঠামো থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ এখনও দুর্বল। পিসিএসডব্লিউ ইউনিটের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ শরীফ আহমেদ জানান, ডিজিটাল প্রমাণ যাচাই শেষে কনটেন্ট সরানো ও অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব, ভুক্তভোগীর দেরিতে অভিযোগ করা এবং সমন্বয়ের অভাবে অনেক মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত করা সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, নারীদের সহায়তায় ২৪ ঘণ্টার বিশেষ সাইবার হেল্পলাইন চালু রয়েছে। হটলাইন নম্বরগুলো হলো ০১৩২০-০০২০০১, ০১৩২০-০০২০০২ এবং ০১৩২০-০০২২২২। এছাড়া ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ ইউনিট তাদের হটলাইন নম্বরের (০১৩২০০০০৮৮৮) মাধ্যমেও অভিযোগ গ্রহণ করছে।

সবশেষে বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের সাবেক সভাপতি শাহিদা আখতার বলেন, “একটি সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নারীদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি মানবাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণেরও প্রশ্ন।”