কক্সবাজারে ভ্যাপসা গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ: আরও কয়েকদিন একই পরিস্থিতি, ২০ তারিখের পর বৃষ্টির সম্ভাবনা
কক্সবাজারসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে কয়েকদিন ধরে তীব্র ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জনজীবন। তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে মাঝারি পর্যায়ে থাকলেও বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে গরমের তীব্রতা অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। এতে করে দিনভর ঘাম, অস্বস্তি ও ক্লান্তিতে ভুগছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মঙ্গলবার (১৬ মে) দুপুরে কক্সবাজার জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় প্রায় ৩৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ আর্দ্রতার কারণে শরীর থেকে ঘাম স্বাভাবিকভাবে শুকাতে না পারায় মানুষের কাছে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে।
শহরের প্রধান সড়ক, পর্যটন এলাকা, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো ঘুরে দেখা যায়, দুপুরের পর থেকেই মানুষের চলাচল কমে যায়। বিশেষ করে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশা ও অটোরিকশা চালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন।
শহরের লিংক রোড এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “সকাল থেকেই প্রচণ্ড গরম অনুভূত হচ্ছে। বাসার ভেতরেও স্বস্তি নেই। ফ্যানের বাতাস গরম লাগছে। বিদ্যুৎ একটু গেলেই অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।”
কলাতলী এলাকার ব্যবসায়ী নুরুল হুদা জানান, “দুপুরের পর দোকানে ক্রেতা অনেক কমে যায়। মানুষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছে না। গরমের কারণে ব্যবসাতেও প্রভাব পড়ছে।”
রিকশাচালক আব্দুর রহিম বলেন, “সারাদিন রাস্তায় রিকশা চালানো খুব কষ্ট হয়ে গেছে। একটু পরপর পানি খেতে হচ্ছে। গরমে শরীর দুর্বল হয়ে যায়।”
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বিকেলের আগে পর্যটকদের উপস্থিতি কম দেখা গেছে। হোটেল মালিক সমিতির এক সদস্য বলেন, “পর্যটকরা বিকেলের আগে সৈকতে নামতে চাইছেন না। দুপুরের গরমের কারণে সবাই হোটেলের ভেতরেই থাকছেন।”
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, আগামী তিন থেকে চার দিন একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। দিনের তাপমাত্রা খুব বেশি না বাড়লেও বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ভ্যাপসা গরম অব্যাহত থাকবে। তবে চলতি মাসের ২০ তারিখের পর বঙ্গোপসাগরে মেঘের প্রবণতা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমে স্বস্তি ফিরতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান বলেন, “বর্তমানে সাগর থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প প্রবেশ করছে। ফলে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ কারণে তাপমাত্রা খুব বেশি না হলেও গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। আগামী কয়েকদিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ২০ তারিখের পর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তখন তাপমাত্রা কমে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।”
চিকিৎসকরাও এই গরমে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কক্সবাজারে স্বনামধন্য চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির জানান, “অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা ও দুর্বলতার ঝুঁকি বাড়ে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রয়োজন ছাড়া দুপুরে বাইরে বের না হওয়া, বেশি বেশি বিশুদ্ধ পানি পান করা, হালকা ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়া এবং সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা উচিত।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে এমন অস্বাভাবিক আবহাওয়া পরিস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ সুরক্ষা ও নগর ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
