ঢাকা সোমবার, ১৮ই মে ২০২৬, ৫ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


গ্রাম ছেড়ে শহরে ছুটছে মানুষ: রংপুরে নগর-দারিদ্র্যের হার দেশের সর্বোচ্চ, যুক্ত হয়েছে ‘পুষ্টিহীনতা’


প্রকাশিত:
১৭ মে ২০২৬ ১৪:১৩

নগরায়ণের চাকচিক্য নেই, তবুও কর্ম আর একমুঠো খাবারের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে প্রতিদিন রংপুর শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে বেছে নিচ্ছেন শহরের ঘিঞ্জি বস্তিগুলো। নদীভাঙন ও কর্মসংস্থানের অভাবে বাধ্য হয়ে শহরমুখী হওয়া এই মানুষদের চাপে রংপুর নগরীতে এখন দারিদ্র্যের হার দেশের সব মহানগরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, রংপুর শহরের প্রতি তিনজনে একজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দারিদ্র্যের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। ‘ক্ষুধার দারিদ্র্য’ রূপ নিয়েছে ‘পুষ্টির দারিদ্র্যে’। অথচ এই বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে রংপুর সিটি করপোরেশনের কাছে নেই কোনো কার্যকর কর্মসূচি বা সুনির্দিষ্ট বাজেট।

বিবিএস-এর খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ হলেও রংপুর বিভাগের শহরগুলোতে এই হার ২৯.৯ শতাংশ, যা দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। পুরো রংপুর বিভাগের সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ২৪.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, গ্রামের চেয়ে শহরের দারিদ্র্যের হারই এখানে বেশি। তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, নগর-দারিদ্র্যের হার খুলনা বিভাগে মাত্র ৯.৯ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১১.৩ শতাংশ এবং ঢাকায় ১৪.৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান রংপুরের একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সংকটের দিকেই ইঙ্গিত করে।

রংপুর নগরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের ‘নাছনিয়া বস্তি’ কিংবা ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের ‘গাইবান্ধাটারী বস্তি’ শহরের এই সংকটের জ্বলন্ত উদাহরণ। একসময়কার নাছনিয়া বিল এখন হাজারখানেক মানুষের আবাসস্থল। বস্তিবাসীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গ্রামে কাজ না থাকা এবং নদীভাঙনই তাদের শহরে আসতে বাধ্য করেছে।

নাছনিয়া বস্তির ৬০ বছর বয়সী চা দোকানি মোসলেমা বেগম বলেন, “কুড়িগ্রামের রাজারহাটে বাড়ি ছিল। তিস্তা নদীতে সব বিলীন হয়ে যাওয়ার পর চরম দারিদ্র্যের কারণে বাধ্য হয়ে এখানে এসেছি। স্বামী রিকশা চালায়।”

গাইবান্ধাটারী বস্তির ৮৯ বছর বয়সী আবদুস সামাদের জীবনের গল্প আরও করুণ। তিনি বলেন, “১৮ বার তিস্তায় বাড়ি ভাঙার পর ১৯ বারে এই বস্তিতে আসছি।” কুড়িগ্রামের থেতরাই থেকে আসা এই প্রবীণ এখন শহরে গরুর ঘাস কেটে সংসার চালান।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপনের মতে, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগের অভাবই এই স্থানান্তরের প্রধান কারণ। তিনি বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগে যারা দরিদ্র হয়েছেন, তাদের জন্য তেমন কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই তিন বেলা খাওয়ার তাগিদে শহরমুখী হওয়া ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প নেই।”

রংপুরের বস্তিগুলোতে এখন আর কেবল ভাতের অভাব নয়, প্রকট হয়ে উঠেছে পুষ্টিহীনতা। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক উত্তম দাস বলেন, “আগে ক্ষুধার দারিদ্র্য ছিল, এখন আমরা পুষ্টির দারিদ্র্য দেখছি।”

সংস্থাটির জরিপে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। নগরের সাতটি ওয়ার্ডে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ৪০ জনই অপুষ্টির শিকার। এর মধ্যে ২০ জন মাঝারি এবং ২০ জন মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে, যাদের অনেককে হাসপাতালেও ভর্তি করতে হয়।

কাজের সন্ধানে নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধাসহ আশপাশের জেলা থেকে মানুষ আসায় রংপুরে কাজের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে ৮২.৭৮ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক কর্মস্থলের সঙ্গে যুক্ত।

শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান রিপন জানান, নগরে অনিয়ন্ত্রিত ইজিবাইক বৃদ্ধির পেছনেও এই কর্মসংস্থানের অভাবই দায়ী। কাজ না পেয়ে নিম্ন আয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে ভাড়ায় ইজিবাইক চালাচ্ছেন। কুড়িগ্রাম থেকে আসা রিকশাচালক হেকমত আলীর কথায়ও একই সুর, “এলাকায় কাজ থাকলে আমি কখনোই এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় আসতাম না।”

বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের চাপ থাকলেও রংপুর সিটি করপোরেশনের হাত কার্যত শূন্য। গত দুই অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সিটি করপোরেশনের জন্য বরাদ্দ ছিল শূন্য। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে ১২টি প্রকল্পের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে, তার সবই অবকাঠামোভিত্তিক; শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কর্মসংস্থানমুখী কোনো প্রকল্প সেখানে নেই।

সিটি করপোরেশনের সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. সেলিম মিয়া বলেন, “কিছু এনজিওর মাধ্যমে দরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ হলেও বর্তমানে বস্তিবাসীর জন্য আমাদের কোনো ফান্ড নেই।”

গত ১৬ মার্চ দায়িত্ব নেওয়া রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী বলেন, “সিটি করপোরেশনে ৭০ শতাংশের বেশি নিম্ন আয়ের মানুষ। সরকারের এদিকে কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও, এই মুহূর্তে দ্রুত নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তেমন কিছু করার নেই।”

সম্প্রতি বিআইডিএস এবং ডব্লিউএফপি-এর এক যৌথ জরিপে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে রংপুর অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার আরও বেড়েছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহামুদুল হক এই পরিস্থিতিকে ‘সক্রিয় মানবিক সংকট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, “শহর এই আশ্রয়হীন মানুষদের জন্য প্রস্তুত নয়। কেবল রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো নয়, এই পরিবারগুলোর কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ, শিশু শিক্ষা ও সঠিক পুষ্টির নিশ্চয়তা জরুরি। তা না হলে রংপুরের নগর-দারিদ্র্য দেশের জন্য একটি বাজে উদাহরণ হয়ে থাকবে।”