ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫শে আগস্ট ২০২৬, ১১ই ভাদ্র ১৪৩৩


লালমনিরহাটে ১২ কোটি টাকা নিয়ে উধাও দুই সমিতি


প্রকাশিত:
২৩ মে ২০২৬ ১৪:২১

লালমনিরহাটে সমবায় সমিতির আড়ালে চড়া সুদে ঋণ ও কিস্তি ব্যবসার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। লোভনীয় মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের পর একের পর এক সমিতি লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। এতে চরম পুঁজি সংকটে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় শত শত নিম্ন আয়ের গ্রাহক।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে 'রাসা' ও 'ব্যতিক্রম' নামে দুটি নামসর্বস্ব সমিতি জেলা থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা নিয়ে রাতারাতি উধাও হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাট শহরের ভোকেশনাল মোড়ে চটকদার বিজ্ঞাপন ও চড়া মুনাফার লোভ দেখিয়ে গড়ে উঠেছিল 'ব্যতিক্রম সমবায় সমিতি'। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে প্রায় ৫ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের পর হঠাৎ করেই তারা যাবতীয় কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। এই ঘটনায় পরবর্তীতে মামলা দায়ের করা হলে সমিতির কয়েকজন কর্মকর্তা গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে থাকলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। একইভাবে, লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর এলাকার 'রাসা সমবায় সমিতি' সহস্রাধিক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করে। এরপর গ্রাহকদের লভ্যাংশ বা মূল টাকা ফেরত না দিয়েই সমিতির চালকেরা

উধাও হয়ে যায়। গ্রাহকদের অভিযোগ, সমবায় অধিদপ্তরের লাইসেন্সকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে চড়া সুদে দাদন ব্যবসা ও ঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার নামে নিরীহ গ্রাহকদের কাছ থেকে খালি চেকে স্বাক্ষর নিয়ে তাদেরকে আইনি ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। এই চক্রের খপ্পরে পড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রামীণ জনপদের দিনমজুর, রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের প্রান্তিক মানুষ।

এদিকে, জেলার আদিতমারী উপজেলার দুরারকুটি এলাকায় এম এ হাসেম ওরফে বাবুল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। 'তিস্তা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি' নামে একটি সরকারি নিবন্ধন নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আমানত সংগ্রহ করছেন। গ্রাহকদের অভিযোগ, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও জমা টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো চড়া মূল্যে নিম্নমানের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি পণ্য কিস্তিতে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোনো কারণে কিস্তি দিতে সামান্য দেরি হলে জমানো সঞ্চয়ের টাকা থেকে কেটে রাখার মতো অনিয়মও ঘটছে প্রতিনিয়ত।

দুরারকুটি এলাকার ভুক্তভোগী অটোচালক মো. ফারুক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রায় সাত বছর আগে কষ্টার্জিত ৯৯ হাজার টাকা তিনি ওই সমিতিতে জমা রেখেছিলেন। আজ পর্যন্ত সেই টাকার পুরোটা তিনি ফেরত পাননি। উল্টো নিজের জমানো টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাকে ভয়ভীতিসহ নানা ধরনের মিথ্যা মামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত এম এ হাসেম ওরফে বাবুল দাবি করেছেন, তিনি সমবায় আইন এবং বিধিমালা মেনেই তাঁর সমিতির সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

এখানে কোনো গ্রাহককে হয়রানি করা হচ্ছে না। লালমনিরহাট জেলা সমবায় কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মাহবুবুল ইসলাম বলেন, 'অভিযুক্ত হাসেমের বিরুদ্ধে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও গ্রাহক হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমাদের কাছে রয়েছে। পুরো বিষয়টি কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী সমিতির নিবন্ধন বাতিলসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহ, রাশেদুল হক প্রধান এই বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, 'সমবায়ের আড়ালে অবৈধ সুদ ব্যবসা, সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের কোনো সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'