গঙ্গাচড়ায় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা: সাজানো মেডিকেল রিপোর্টের অভিযোগ
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিক মো. রিয়াদুন্নবী রিয়াদের বাড়িতে হামলার ঘটনার পর দায়ের হওয়া পাল্টা মামলাকে শক্তিশালী করতে অতিরঞ্জিত ও প্রশ্নবিদ্ধ মেডিকেল ইনজুরি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডাঃ মো. সাদমান সাকিফ।
প্রাপ্ত চিকিৎসা নথি, হাসপাতালের রেজিস্টার, ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একই ঘটনার আহতদের বিষয়ে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিবেদনে আঘাতের ধরন, অস্ত্রের প্রকৃতি এবং ক্ষতের পরিমাপ নিয়ে উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি রয়েছে।
জানা যায়, গত ১৮ মার্চ সাংবাদিক রিয়াদের বাড়িতে হামলার ঘটনায় তিনি মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে ওই মামলার অন্যতম আসামি তাজমিনা বেগম সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে উপস্থাপন করা হয় গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল রিপোর্ট।
নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রিপোর্টে তাজমিনা বেগমের মাথার আঘাতকে Incise Looking Wound হিসেবে উল্লেখ করা হলেও Weapon Used অংশে Blunt বা ভোঁতা বস্তুর আঘাত বলা হয়েছে। একই ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে তাজুল ইসলামের ক্ষেত্রেও। অথচ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনজুরি সার্টিফিকেটে একই আঘাতকে Incised Wound এবং Sharp বা ধারালো অস্ত্রের আঘাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, একই আঘাত এক সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের কাছে ভোঁতা বস্তুর আঘাত এবং অন্য সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের কাছে ধারালো অস্ত্রের আঘাত হিসেবে বিবেচিত হলো কীভাবে? চিকিৎসা মতামতের এ ধরনের মৌলিক পার্থক্যের কারণ কী-তা নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
শুধু আঘাতের ধরনই নয়, ক্ষতের পরিমাপেও রয়েছে বড় ধরনের অমিল। গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রিপোর্টে তাজুল ইসলামের মাথার ক্ষত ৪ সেন্টিমিটার × ১ সেন্টিমিটার × ০.৫ সেন্টিমিটার এবং ফোলা লালচে অংশ ৬ সেন্টিমিটার × ৫ সেন্টিমিটার উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রিপোর্টে একই ক্ষত ১.৫ সেন্টিমিটার এবং আংশিক ত্বক গভীরতার ক্ষত হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
একইভাবে তাজমিনা বেগমের ক্ষেত্রে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রিপোর্টে ক্ষতের পরিমাপ ৪ সেন্টিমিটার × ০.৫ সেন্টিমিটার × ১ সেন্টিমিটার বলা হলেও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিবেদনে তা ৩ সেন্টিমিটার এবং আংশিক ত্বক গভীরতার ক্ষত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডাঃ মো. সাদমান সাকিফ বলেন, আমরা রক্ত বন্ধ করে রংপুর মেডিকেলে রেফার করেছি। সে কারণেই এখান থেকে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। ইনজুরির মাত্রা বেশি উল্লেখ করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমাকে আদালতে ডাকলে আমি জবাব দেব।
তবে রেফার সংক্রান্ত বিষয়েও নথিতে অসঙ্গতি দেখা গেছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনজুরি সার্টিফিকেটের Referred From অংশে N/A উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ ওই নথিতে অন্য কোনো হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে আসার তথ্য নেই। অথচ গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক দাবি করছেন, আহতরা প্রথমে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছিলেন।
ভর্তি সংক্রান্ত তথ্যেও রয়েছে অস্পষ্টতা। গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রিপোর্টে জরুরি বিভাগের রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকলেও ভর্তি, ছাড়পত্র, আবাসিক রোগী নিবন্ধন নম্বর এবং শয্যা নম্বর অংশ ফাঁকা রয়েছে। অর্থাৎ নথি অনুযায়ী জরুরি বিভাগে পরীক্ষা করা হলেও ভর্তি থাকার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নথিতে আবাসিক রোগী নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ রয়েছে এবং ১৮ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ভর্তি থাকার তথ্য লিপিবদ্ধ আছে।
চিকিৎসা ও আইন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফৌজদারি মামলায় মেডিকেল রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে একই ঘটনার ক্ষেত্রে আঘাতের ধরন, অস্ত্রের প্রকৃতি, ক্ষতের পরিমাপ এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়া নিয়ে এমন অসঙ্গতি থাকলে বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মো. আলেমুল বাসার বলেন, আমরা তো আনুমানিক লিখেছি। তবে মেডিকেল সার্টিফিকেটে সেটি আনুমানিক বলে উল্লেখ করা উচিত ছিল। আদালত প্রয়োজন মনে করলে দায়িত্বরত চিকিৎসককে ডেকে ব্যাখ্যা চাইতে পারবেন।
এ বিষয়ে রংপুর জেলা সিভিল সার্জন কর্মকর্তা ডা : শাহীন সুলতানা বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের অসঙ্গতি ও চিকিৎসকদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে বিষয়টি তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
