খাবারের প্লেটে বিষাক্ত প্লাস্টিক ও ভারী ধাতু! ভৈরব-রূপসার দূষণে হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও সুন্দরবন
প্লাস্টিক দূষণ এখন আর কেবল দূরের মহাসাগর বা শিল্পাঞ্চলের গল্প নয়, এটি সরাসরি চলে এসেছে আমাদের প্রতিদিনের খাবার টেবিলে। নদীর মাছের পেট হয়ে মানুষের মস্তিষ্ক, রক্ত ও ধমনিতে প্রবেশ করছে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক (ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা) ও ভারী ধাতু। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণ ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশে মিলেছে প্লাস্টিক ও ক্যাডমিয়াম-সিসার মতো ভারী ধাতুর ভয়াবহ উপস্থিতি। এর ফলে একদিকে যেমন ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনসহ গোটা উপকূলীয় প্রতিবেশ।
সম্প্রতি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের এক গবেষণায় এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গত জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ইমার্জিং কন্টামিন্যান্টস’-এ এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। যবিপ্রবির গবেষক নিশাত সালসাবিল, মো. তৌহিদুজ্জামান, তাপস কুমার চক্রবর্তী ও গোপাল চন্দ্র ঘোষ যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
গবেষকরা ভৈরব ও রূপসা নদীর ৯টি জনবহুল পয়েন্ট (রূপদিয়া, নওয়াপাড়া, ফুলতলা, সিএসডি ঘাট, জেলখানা ঘাট, রূপসা সেতু প্রভৃতি) থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, নদীর তলদেশের ১০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার গভীর পলিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রতি কেজি পলিতে গড়ে ৩ হাজার ৬০০টি এবং সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৭০০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফ্র্যাগমেন্ট ৫১ শতাংশ, ফাইবার ২৬ শতাংশ এবং ফিল্ম ১৮ শতাংশ। প্লাস্টিকের ধরনগুলোর মধ্যে পলিইথিলিন, পলিস্টাইরিন ও পলিপ্রোপিলিনসহ ৭ ধরনের পলিমারের উপস্থিতি মিলেছে। পাশাপাশি নদীর তলদেশে মিলেছে উচ্চমাত্রার ক্রোমিয়াম, নিকেল, কপার, সিসা ও ক্যাডমিয়াম।
পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক (পিইআরআই) অনুযায়ী, এই নদীর পলিতে দূষণের মাত্রা এখন ‘অত্যন্ত উচ্চ’ পর্যায়ের। জলজ প্রাণী ও মাছ খাবার হিসেবে এসব প্লাস্টিক গ্রহণ করায় তা সহজেই মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।
খুলনা মহানগরী ও যশোরের নওয়াপাড়া এলাকার অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই এই দূষণের প্রধান কারণ। খুলনা সিটি করপোরেশনের ২২টিরও বেশি ড্রেন দিয়ে সরাসরি ভৈরব ও রূপসায় বর্জ্য মিশছে। নওয়াপাড়ার ট্যানারিসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানার কেমিক্যালও পড়ছে নদীতে।
জাতিসংঘের একটি জরিপ বলছে, খুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৭৩২ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে সিটি করপোরেশন ব্যবস্থাপনা করে মাত্র ৪৬১ টন। বাকি বর্জ্যের গন্তব্য হচ্ছে ড্রেন, খাল ও নদী।
পূর্ব রূপসা পাড়ের মৎস্যজীবী জাবেদ হোসেন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "দিন দিন নদীর মাছ কমছে। আগে জাল ফেললেই মাছ পেতাম, এখন নদীর তীরে ও পানিতে শুধু প্লাস্টিকের বোতল আর আবর্জনা ভাসে। বেঁচে থাকাই কষ্টকর হয়ে গেছে।"
ভৈরব ও রূপসার এই দূষিত পানি জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে সরাসরি প্রবেশ করছে সুন্দরবনে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুজিবুর রহমান বলেন, "শিল্পকারখানার কেমিক্যাল ও শহরের বর্জ্য বাধাহীনভাবে নদীতে পড়ছে। জোয়ার-ভাটার কারণে এই দূষিত পলি ম্যানগ্রোভ বনের গভীরে পৌঁছে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করছে। দ্রুত আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।"
ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সায়ন ভট্টাচার্য জানান, সুন্দরবনে পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল থেকে বিপুল মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হচ্ছে, যা গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করছে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, "কলকারখানা ও গৃহস্থালি বর্জ্য নদীতে ফেলা এখনই বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে মানুষের জীবন ও পরিবেশ চরম হুমকিতে পড়বে।"
পরিবেশ পুরোপুরি দূষণমুক্ত করা সময়সাপেক্ষ হলেও, সচেতনতার মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে কিছুটা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে:
প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা মূলত মাছের পাকস্থলী ও অন্ত্রে জমে থাকে। তাই রান্নার আগে মাছের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি ও ময়লা পুরোপুরি ফেলে দিতে হবে। পরিষ্কার করার পর বহমান পানিতে (ট্যাপের নিচে) মাছটি ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। দূষিত নদীর বড় মাছের চেয়ে তুলনামূলক ছোট মাছ, গভীর জলের মাছ বা চাষের মাছ খাওয়া অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। অনেক সময় মাছের চামড়ার নিচেও ক্ষতিকর কণা জমতে পারে, তাই মাছ খাওয়ার সময় পেটের দিকের অংশ বা চামড়া এড়িয়ে চলা স্বাস্থ্যকর।
প্লাস্টিকের এই নীরব আগ্রাসন থেকে বাঁচতে হলে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে কঠোর আইন প্রয়োগ ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
