দায়মুক্তি দিয়ে ফিরছে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ! ২০ খাতে মিলতে পারে কর ছাড়
অর্থনীতিতে গতি আনতে ও বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী জাতীয় বাজেটে আবারও অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত সুযোগটি ফিরিয়ে আনার কথা সক্রিয়ভাবে ভাবছে সরকার। বিশেষ করে আবাসন খাতে অর্থের উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন না করার (পূর্ণ দায়মুক্তি বা ইনডেমনিটি) বিধানটি পুনর্বহাল হতে পারে। একই সঙ্গে, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী ২০টিরও বেশি খাতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘ট্যাক্স হলিডে’ বা কর অবকাশ সুবিধা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে এই উদ্যোগকে ‘আত্মঘাতী’ ও ‘সংবিধান পরিপন্থী’ আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও দুর্নীতিবিরোধী বিশ্লেষকরা।
বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত এই সুবিধা বিনিয়োগকারীদের অর্থের উৎসের বিষয়ে যেকোনো ধরনের আইনি তদন্ত থেকে সুরক্ষা দেবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আসতে পারে। তবে এটি কী ফরম্যাটে হবে বা ট্যাক্স রেট কেমন হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।”
এনবিআরের আরেক কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেন, “অর্থের উৎস প্রকাশের ক্ষেত্রে পূর্ণ দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) দিয়েই এই সুবিধা চালু করা হতে পারে। কেননা ইনডেমনিটি না দিলে কর কমিয়ে দিলেও ভবিষ্যতের আইনি ঝুঁকির কারণে কেউ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন না। কোনো সংস্থা প্রশ্ন করার সুযোগ পেলে এই টাকা অর্থনীতিতে আসবে না।”
জানা গেছে, সাম্প্রতিক বাজেট আলোচনাগুলোতে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা কালো টাকা বিনিয়োগের সুবিধা পুনর্বহালের জোর দাবি তুলেছেন। যদিও এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এর আগে এ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের অনাগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চালু করা এই দায়মুক্তির সুবিধা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাতিল করেছিল। এখন আবারও এটি চালুর গুঞ্জনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সুশীল সমাজ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই উদ্যোগকে ‘আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “নির্বাচনি ইশতেহারে এ সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কমিটমেন্ট করেছে। ফলে কালো টাকা সাদা করার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। এই সুযোগ দুর্নীতির সহায়ক, বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ সুযোগ দেওয়া হলে তারা জনগণকে কী জবাব দেবে?”
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলেও, সবচেয়ে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে। সেবার মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে ঢালাওভাবে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। ওই বছর দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাদা করেছিলেন, যেখান থেকে এনবিআর রাজস্ব পেয়েছিল ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।
বর্তমানের নিয়মে যেকোনো ব্যক্তি অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে চাইলে তাকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর এবং তার ওপর আরও ১০ শতাংশ জরিমানা গুনতে হয়। তাছাড়া বর্তমান নিয়মে দুদক বা অন্য যেকোনো সংস্থা অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার রাখে।
অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার পাশাপাশি, বিগত বাজেটে বাতিল হওয়া ৩২টি খাতের মধ্যে অন্তত ২০টি উৎপাদনমুখী খাতে ‘ট্যাক্স হলিডে’ পুনর্বহালের কথা ভাবছে সরকার।
এই সুবিধা পেতে পারে এমন খাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ওষুধ (এপিআই), কৃষি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স (রেজিস্টর, ট্রানজিসটর, পিসিবি), বাইসাইকেল ও খুচরা যন্ত্রাংশ, জৈব সার, অটোমোবাইল পার্টস, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং, চামড়াজাত পণ্য এবং খেলনা উৎপাদন খাত। এছাড়া ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিনির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, রোবোটিক্স এবং ন্যানোটেকনোলজি ভিত্তিক পণ্য উৎপাদনও এই সুবিধার আওতায় আসতে পারে।
এর আগে এসব খাতে বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রথম দুই বছর আয়ের ওপর প্রযোজ্য করের ৯০ শতাংশ ছাড় পেত উদ্যোক্তারা। এরপর ধাপে ধাপে দশম বছর পর্যন্ত ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হতো।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)-এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, “অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে বিনিয়োগ প্রয়োজন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম খাতকে ট্যাক্স সুবিধা দিলে তা ইতিবাচক হবে। তবে যে সুবিধাই দেওয়া হোক, তা দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য হতে হবে।”
আয়কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশিষ বড়ুয়া মনে করেন, ঢালাওভাবে না দিয়ে খাতের পারফরম্যান্স বা কর্মক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে প্রণোদনা দেওয়া বেশি যৌক্তিক। অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, গত বছর হঠাৎ কর সুবিধা বাতিল করে এখন আবার তা ফিরিয়ে আনা হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যেকোনো সিদ্ধান্ত গভীর গবেষণার ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।
