ঢাকা রবিবার, ৭ই জুন ২০২৬, ২৫শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


কাদামাখা পানি খেয়ে জিরো লাইনে কাটছে দিন, সীমান্তে পুশইন চেষ্টার শিকার ১০ সদস্যের মানবেতর জীবন


প্রকাশিত:
৭ জুন ২০২৬ ১৮:৪৭

‘বিশুদ্ধ পানি নেই, তৃষ্ণা মেটাতে কখনো কখনো জমে থাকা কাদামাখা পানি খেতে হচ্ছে। দুইটা রাত কাদা-পানির মধ্যে কাটিয়ে দিলাম। রাতে বৃষ্টি আর দিনে প্রচণ্ড রোদ। ঠিকমতো খাবারও জুটছে না। নারী-শিশুদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে জানি না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই নিজেদের চরম দুর্ভোগের কথা বলছিলেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ী সীমান্তের শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) আটকে পড়া আব্দুস সালাম। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইন চেষ্টার শিকার হয়ে গত তিন দিন ধরে দুই পরিবারের ১০ সদস্য এখানে আটকা পড়ে আছেন।

স্থানীয় ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দিবাগত রাতে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ী সীমান্তের মেইন পিলার ৭৫৮-এর ৫ নম্বর সাব-পিলার এলাকা দিয়ে ১০ জন নারী, শিশু ও পুরুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাৎক্ষণিক এতে বাধা দিলে তারা দুই দেশের মধ্যবর্তী জিরো লাইনে আটকা পড়েন। এরপর থেকে আজ রবিবার (৭ জুন) পর্যন্ত টানা তিন দিন ধরে তারা সেখানে অবস্থান করছেন।

রবিবার সকালে সরেজমিনে বড়বাড়ী সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, ফসলি জমির আইলের ওপর প্লাস্টিক টাঙিয়ে অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করে কোনো রকমে আশ্রয় নিয়েছেন এই দুই পরিবারের সদস্যরা। বৈরী আবহাওয়ায় তাদের জীবন ওষ্ঠাগত। দিনের প্রখর রোদ আর রাতের বৃষ্টিতে তারা ভিজে একাকার হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে পরিবার দুটির শিশু ও বৃদ্ধরা। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে মানবেতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সেখানে।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তিন দিন ধরে নারী-শিশুদের এই কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগছে। মানবিক কারণে আমরা সাহায্য করতে চাই, কিন্তু সীমান্ত পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে সব সময় তা সম্ভব হয় না। মানুষগুলো এভাবে কতদিন থাকবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।’

হাড়িভাসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইয়েদ নুরে আলম বলেন, ‘মানুষকে এভাবে সীমান্তে ফেলে রাখা কোনোভাবেই মানবিক নয়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে তারা চরম দুর্ভোগে আছেন। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির স্থায়ী সমাধান করা উচিত।’

বিজিবি জানায়, পরিস্থিতি নিরসনে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একাধিক দফা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএসএফ দাবি করছে, সীমান্তে অবস্থানকারীরা বাংলাদেশি নাগরিক। তবে বিজিবি এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে। বিজিবির মতে, আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে রাতের আঁধারে কাউকে পুশইন করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

নীলফামারী বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি এবং বিএসএফের সঙ্গে একাধিক পতাকা বৈঠক করেছি। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে সম্মানজনক উপায়ে বিষয়টির সমাধানে আমরা কাজ করছি।’

কতক্ষণে এই অনিশ্চয়তার অবসান হবে, তা এখনো অস্পষ্ট। তবে খোলা আকাশের নিচে আটকে থাকা এই ১০ জন মানুষের আর্তনাদ সীমান্তজুড়ে এক মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।