ঢাকা রবিবার, ১৭ই মে ২০২৬, ৩রা জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


শরীয়তপুরে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড

প্রবাসফেরত স্বামীকে হত্যার পর হাড়-মাংস আলাদা, জানা গেল কারণ


প্রকাশিত:
১৬ মে ২০২৬ ১৯:৪৯

পারিবারিক কলহের জেরে প্রবাসফেরত স্বামী জিয়া সরদারকে রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যার পর মরদেহ ৬ টুকরো করেছেন স্ত্রী আসমা আক্তার। শুধু তাই নয়, লাশ গুম করতে হাড় ও মাংস আলাদা করে তিনদিন ড্রামে ভরে রাখেন তিনি। এরপর কাটা মাংস অন্যের ফ্রিজে রাখতে গিয়ে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ালে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এই গৃহবধূ। শরীয়তপুর সদর উপজেলার চন্দ্রপুর এলাকায় এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

নিহত জিয়া সরদার শরীয়তপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ মাহমুদপুর ৭নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন মালয়েশিয়া প্রবাসী ছিলেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মালয়েশিয়া থাকাকালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পিরোজপুর জেলার আসমা আক্তারের সঙ্গে জিয়ার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আট বছর আগে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দুজনেরই এটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়ের পর আসমাকে শরীয়তপুর শহরের উত্তর পালং সাবনুর মার্কেট এলাকায় ভাড়া বাসায় রাখেন জিয়া। গত বছর জিয়া একেবারে দেশে ফিরে এলে তারা চন্দ্রপুর বাজারের গ্রামীণ ব্যাংকের পেছনের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন।

সম্প্রতি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ চরমে পৌঁছায়। এর জেরে গত ১২ মে রাতে দুজনের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে জিয়ার মাথায় লোহার রড দিয়ে সজোরে আঘাত করেন স্ত্রী আসমা। এতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান জিয়া।

হত্যার পর লাশ গুম করতে পৈশাচিক পথ বেছে নেন আসমা। রান্নাঘরের ছুরি দিয়ে স্বামীর দেহকে ৬ টুকরো করেন তিনি। আলাদা করে ফেলেন হাড় ও মাংস। এরপর সেগুলো ড্রামে ও ফ্রিজে তিনদিন লুকিয়ে রাখেন।

শুক্রবার (১৫ মে) রাতে একটি অটোরিকশা ভাড়া করেন আসমা। এরপর লাশের কয়েকটি টুকরো (খণ্ডিত হাত-পা) সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়িয়ে নড়িয়ার মুলফৎগঞ্জ এলাকায় পদ্মা নদীর তীরে ফেলে আসেন। বাকি অংশ বস্তায় ভরে শরীয়তপুর পৌরসভার আটং বৃক্ষতলা এলাকার একটি পুকুরে ফেলে দেন।

দেহের হাড় ও অন্যান্য অংশ ফেলে দিলেও পচে যাওয়া মাংসগুলো শহরের উত্তর পালং সাবনুর মার্কেট এলাকায় তার আগের ভাড়া বাসার এক ভাড়াটিয়া রানু বেগমের ফ্রিজে রাখতে যান আসমা। রানু বেগম জানান, আসমা পচা মাংস ফ্রিজে রাখতে এলে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে তাদের সন্দেহ হয়। পরে স্থানীয়রা জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল করে পুলিশকে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে পালং মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পলিথিনে মোড়ানো মাংসসহ আসমাকে হাতেনাতে আটক করে।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অকপটে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন আসমা আক্তার। স্বামীর প্রতি এতো নিষ্ঠুরতার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমার স্বামী প্রায়ই আমাকে মারধর করতো। ১২ মে রাতে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রড দিয়ে আঘাত করলে সে মাটিতে পড়ে যায়। আমি বুঝতে পারিনি এতো জোরে আঘাত লাগবে। পরে ভয় পেয়ে চাকু দিয়ে লাশ টুকরো টুকরো করে কয়েক জায়গায় ফেলে দেই। আমি জীবনে একটা পিঁপড়াও মারিনি। কিন্তু এ ঘটনা কীভাবে ঘটে গেলো, আমি বুঝতে পারিনি।"

এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে নিহতের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জিয়ার আত্মীয় শাহাদাত হোসেন শাহেদ বলেন, "ভাই দেশে আসার পর স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো। ওই নারী আমার ভাইকে নির্মমভাবে খুন করে ড্রামে ভরে রেখেছে। আমরা এই নিষ্ঠুর অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"

পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, "স্থানীয়দের খবরের ভিত্তিতে আমরা ড্রাম খুলে মাংসগুলো উদ্ধার করি এবং আসমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করি। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত সাড়ে ৯টার দিকে আটং বৃক্ষতলা এলাকার একটি পুকুর থেকে মাথাসহ হাড় উদ্ধার করা হয়। এছাড়া নড়িয়া থানা পুলিশ পদ্মা নদীর তীর থেকে নিহতের খণ্ডিত চার হাত-পা উদ্ধার করেছে।"

এ ঘটনায় আসমার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।